
তেহরান,২৩ অক্টোবর- যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন করে সামরিক হামলার আশঙ্কার মধ্যে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নজিরবিহীন পাল্টা আঘাত হানার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নতুন করে কোনো হামলা শুরু করলে ইরানের প্রতিক্রিয়ার কোনো সীমা থাকবে না। এ ক্ষেত্রে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্তত সাতটি দেশে থাকা তেল স্থাপনা, সমুদ্রের তলদেশে থাকা ইন্টারনেট ক্যাবল, ডেটা সেন্টার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় সরাসরি হামলা চালানো হবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে তেহরান।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মহসেন রেজাই সতর্ক করে বলেছেন, এমন কোনো পরিস্থিতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না, যেখানে ইরানের অর্থনৈতিক জীবনরেখায় হামলা চালানো হবে, অথচ সেই হামলায় সহায়তাকারী অঞ্চলের অর্থনৈতিক অবকাঠামো নিরাপদ ও অক্ষত থাকবে। ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিনি জানান, আবার যুদ্ধ শুরু হলে সমুদ্রের তলদেশে থাকা ক্যাবল, ডেটা সেন্টার ও এআই স্থাপনাগুলো তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হবে। এবার ইরানের পরিকল্পনা আরও বিস্তৃত হবে বলেও জানান তিনি।
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত ইরানি প্রতিনিধিদলের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মেহেদি মোহাম্মাদি। তিনি জানিয়েছেন, তেহরান পরবর্তী যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাতকে নিজেদের অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখছে। দুই বছরের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো শুরু হতে যাওয়া এই যুদ্ধ ইরানের টিকে থাকার লড়াই হওয়ায় এবার তাদের সামরিক কৌশলে কোনো বাধা বা সীমারেখা থাকবে না। মোহাম্মাদি আরও জোর দিয়ে বলেন, ইরান যুদ্ধের সময় ও ভৌগোলিক বিস্তারের প্রচলিত সীমা ভেঙে দেবে। অর্থাৎ শত্রুপক্ষের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে এবং আরও বিস্তৃত এলাকাজুড়ে এই যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
সম্প্রতি মার্কিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে যৌথভাবে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর জন্য মার্কিন সামরিক উপদেষ্টারা ইতিমধ্যে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর একটি বিস্তারিত তালিকা তৈরি করেছেন। এরই মধ্যে তেল আবিবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। যৌথ হামলার সময় ও উদ্দেশ্য নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হলেও হামলা সফল হবে, এমন কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা তাদের হাতে নেই। বৈঠকে নেতানিয়াহু এমন আগ্রহ দেখিয়েছেন যে ইরান যেন আগে হামলা চালায়। তবে রাজনৈতিক দিক বিবেচনায় ট্রাম্প প্রশাসন নভেম্বরের আগেই ওই অঞ্চলে তিনটি বিমানবাহী রণতরী, হাজার হাজার মেরিন সেনা, যুদ্ধবিমান এবং স্পেশাল অপারেশন ফোর্সেস মোতায়েনের কাজ শেষ করতে চায়।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের এই তীব্র উত্তেজনার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়েছে। সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলের ট্যাঙ্কারে ইরানি হামলার খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৩.৪ ডলারে উঠে নতুন রেকর্ড গড়েছে। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ রেজা নাসরি যুদ্ধের সম্ভাব্য ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেছেন, এই যুদ্ধের তৃতীয় পর্যায় কোনো একটি জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। পুরো অঞ্চলের বিদ্যুৎ গ্রিড, পানি শোধনাগার, তেল শোধনাগার ও বন্দরগুলো আগুনে জ্বলবে। কোটি কোটি মানুষ পানি ও বিদ্যুৎ ছাড়া হয়ে পড়বে এবং আরব বিশ্ব থেকে ইউরোপের দিকে বিশাল শরণার্থী স্রোত তৈরি হবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক অর্থনীতি চরম মন্দার মধ্যে পড়ে ধসে যাবে।
বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ ফার্স বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হলে কোনো ইরানি কর্মকর্তা বা সাধারণ বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটলে সামরিক লক্ষ্যবস্তুর পাশাপাশি রাজনৈতিক কেন্দ্রগুলোতেও সরাসরি হামলা চালানোর নির্দেশ দিয়ে রেখেছে ইরান।
অন্যদিকে, এই তীব্র উত্তেজনার মধ্যেও পাকিস্তান ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি এবং চুক্তি সংশোধনের কূটনৈতিক পথ খোঁজা হচ্ছে। প্রস্তাবিত সমঝোতায় জাতিসংঘের পরিদর্শকদের ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্র পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়া, ইউরেনিয়াম রপ্তানি এবং অবরোধ প্রত্যাহারের বিনিময়ে আটকে থাকা কোটি কোটি ডলারের সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয় রয়েছে। তবে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আগে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করলে তারা এসব আলোচনা এগিয়ে নেবে না এবং হরমুজ প্রণালির অবরোধও তুলে নেবে না।
এস এম/ ২৩ অক্টোবর ২০২৬









Be First to Comment