Press "Enter" to skip to content

নতুন মার্কিন হামলা হলে উপসাগরের সাবমেরিন ক্যাবলে হামলার হুমকি ইরানের

উপসাগরের সাবমেরিন ক্যাবলে হামলার হুমকি ইরানের

তেহরান,২৪ অক্টোবর- যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নতুন করে সামরিক আগ্রাসন চালালে পারস্য উপসাগরের সমুদ্রের তলদেশে থাকা যোগাযোগ ও ইন্টারনেট ক্যাবলে (সাবমেরিন ক্যাবল) বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করেছে ইরান। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের দুই জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।

তারা সতর্ক করে বলেছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান বা সম্ভাব্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ইরানের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইরানের ওই দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তা এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি। তেহরান কীভাবে বা ঠিক কোন জায়গায় এ ধরনের হামলা চালাতে পারে, সে বিষয়েও তারা কিছু বলেননি। তবে তাদের একজন জানিয়েছেন, হামলার পর মেরামতের কাজ বাধাগ্রস্ত করাই হবে ইরানের লক্ষ্য। এর মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগসহ যোগাযোগ ব্যবস্থায় অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত করতে চায় দেশটি।

ওই দুই কর্মকর্তার একজন বলেন, ‘ইরানে হামলা চালানো হলে আর কোনো লাল রেখা (রেড লাইন) থাকবে না… সমুদ্রগর্ভস্থ ক্যাবল থেকে শুরু করে গোপন ঘাঁটিসহ সামরিক ঘাঁটি পর্যন্ত।’

ওয়াশিংটনকে ‘আগুন নিয়ে খেলা’ থেকে বিরত থাকার হুঁশিয়ারি দিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, সমুদ্রগর্ভস্থ ক্যাবলগুলোতে ইরানের সম্পূর্ণ প্রবেশাধিকার রয়েছে এবং দেশটি সহজেই এগুলো ধ্বংস করতে সক্ষম।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) রাজনৈতিক বিষয়ক উপপ্রধান ইয়াদুল্লাহ জাভানি বুধবার জানিয়েছেন, ইরানের অবকাঠামোয় হামলা হলে হরমুজ প্রণালির তলদেশে থাকা সাতটি প্রধান ইন্টারনেট ক্যাবলকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে ইরান।

জাতিসংঘের সংস্থা আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ ইন্টারনেট ট্রাফিক সমুদ্রগর্ভস্থ ক্যাবলের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। তবে টেলিযোগাযোগ গবেষণা সংস্থা টেলিজিওগ্রাফির গবেষণা পরিচালক অ্যালান মল্ডিন জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ১ শতাংশেরও কম চলাচল করে। ফলে সেখানে ইরানের এমন হামলার বৈশ্বিক প্রভাব সীমিত হতে পারে।

হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানকে আলাদা করেছে। একই সঙ্গে এই প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের এই বক্তব্যের বিষয়ে রয়টার্স যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে মন্তব্য জানতে চেয়েছিল। তবে কোনো পক্ষই সাড়া দেয়নি। উপসাগরীয় দেশগুলোর পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

সমুদ্রগর্ভস্থ ক্যাবলে সম্ভাব্য হামলার এই পরিকল্পনা থেকে বোঝা যায়, ইরানের নেতৃত্ব মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে সামরিক অভিযান চালালে তার জবাব আগের চেয়ে আরও কঠোরভাবে দিতে হবে।

ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই চলতি মাসে সতর্ক করে বলেছিলেন, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গবেষণাগারসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।

ওয়াশিংটনের উপসাগরীয় মিত্ররা এ ধরনের অবকাঠামোতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে। ইরানের দ্বিতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, সমুদ্রগর্ভস্থ ক্যাবলের কোনো ক্ষতি হলে এর জন্য তেহরানকে নয়, ওয়াশিংটনকে দায়ী করা উচিত।

ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান প্রোগ্রামের পরিচালক অ্যালেক্স ভাতানকা বলেন, নতুন করে সংঘাত ঠেকানো এবং উপসাগরীয় সরকার ও মার্কিন কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি করে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই এসব হুমকির মূল উদ্দেশ্য।

ভাতানকা বলেন, ‘তেহরান চায় উপসাগরীয় দেশগুলো ও করপোরেট নির্বাহীরা যেন (মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড) ট্রাম্পের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন, যাতে তাঁর নীতি তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনায় যে ঝুঁকি তৈরি করছে, তা তুলে ধরা যায়।’

বিশ্লেষকদের মতে, একাধিক ক্যাবল কেটে দেওয়া হলে ইন্টারনেটের গতি কমে যেতে পারে। পাশাপাশি আর্থিক লেনদেন, ই-কমার্স এবং ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের কার্যক্রমও ব্যাহত হতে পারে। অ্যালান মল্ডিন জানিয়েছেন, এর প্রভাব নির্ভর করবে অপারেটররা কীভাবে ইন্টারনেট ট্রাফিক বিকল্প পথে পরিচালিত করেন এবং বিকল্প সংযোগগুলোতে কতটা ধারণক্ষমতা রয়েছে, তার ওপর।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধের সময় ইন্টারনেট সংযোগ পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এ ছাড়া বীমার খরচ বেড়ে যাওয়া এবং জলসীমায় প্রবেশের অনুমতি পেতে দেরি হওয়ার কারণে ক্যাবল মেরামতের কাজ আরও জটিল হতে পারে।

হরমুজ প্রণালির তুলনায় লোহিত সাগর আরও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে ইরান যদি ইয়েমেনের মিত্র হুথিদের সমর্থন পায়। তবে লোহিত সাগরে ক্যাবলকে লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়ে তেহরান প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য দেয়নি।

মল্ডিন জানিয়েছেন, ইউরোপ, পূর্ব আফ্রিকা ও এশিয়ার মধ্যে ডেটা পরিবহনে লোহিত সাগর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই পথ দিয়ে বৈশ্বিক আন্তর্জাতিক চাহিদার প্রায় ৩ শতাংশ এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে চলাচলকারী ইন্টারনেট ট্রাফিকের প্রায় ১০ শতাংশ পরিবাহিত হয়।

উপসাগরীয় দেশগুলো তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে প্রযুক্তি খাতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। এর ফলে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এসব দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।

গত মার্চে ইরানের হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে সরাসরি অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের দুটি স্থাপনায় আঘাত হানা হয়েছিল। একই সময়ে বাহরাইনে এই প্রতিষ্ঠানের একটি স্থাপনের পাশের অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। মার্চে যুদ্ধের উত্তেজনা যখন চরমে পৌঁছায়, তখন আইআরজিসি মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যাপল ও এনভিডিয়াসহ মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ঘোষণা করেছিল।

স্থলভিত্তিক সংযোগ ইন্টারনেট ট্রাফিকের জন্য বিকল্প পথ তৈরি করতে পারে। এ কারণে সংযোগের সক্ষমতা বাড়াতে উপসাগরীয় দেশগুলো এবং মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করছে। মাইক্রোসফটের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সমুদ্রগর্ভস্থ ও স্থলভিত্তিক সংযোগ অবকাঠামোয় ৪০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করবে প্রতিষ্ঠানটি।

এস এম/ ২৪ অক্টোবর ২০২৬

More from আন্তর্জাতিকMore posts in আন্তর্জাতিক »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Mission News Theme by Compete Themes.