
রাজশাহী: দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (রাকসু) নির্বাচন। আর ওই নির্বাচনকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের সামনে ১২ মাসে ২৪ দফা ইশতেহার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল শিবির সমর্থিত প্যানেল ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’। সে পরিপ্রেক্ষিতে সহ-সভাপতি (ভিপি), সহ-সাধারণ সম্পাদকসহ (এজিএস) ২৩টি পদের মোট ২০টিতে জয় পায় তারা। কিন্তু নির্বাচনের ছয় মাস পার হয়ে গেলেও অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নেই কোনো অগ্রগতি। ঘোষিত ২৪ দফা ইশতেহারের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৪ দফায় দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা গেছে। ফলে রাকসুর কার্যক্রম নিয়ে ক্যাম্পাসজুড়ে উঠছে নানা প্রশ্ন।
শিবির সমর্থিত প্যানেলের ঘোষিত ২৪ দফা ইশতেহারের মধ্যে ছিল মানসম্মত খাবারের নিশ্চয়তা, অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের অধিকার সংরক্ষণ, লাইব্রেরি ও রিডিং রুম সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিতকরণ এবং চিকিৎসাকেন্দ্রের আধুনিকীকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি। এ ছাড়া, তথ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, অন-ক্যাম্পাস জব চালু, পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসি বাস্তবায়ন এবং ক্লিন অ্যান্ড গ্রিন ক্যাম্পাস গঠনের অঙ্গীকারও ছিল তাদের ইশতেহারে।
শিবির সমর্থিত প্যানেলের ইশতেহার শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি করলেও গত ছয় মাসে সেই আশা ধীরে ধীরে হতাশায় পরিণত হয়েছে। আবাসন সংকট, হলের খাবারের মানোন্নয়ন, নিরাপদ পরিবহণ এবং প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনে দৃশ্যমান পরিবর্তনের অপেক্ষায় থাকা শিক্ষার্থীরা এখন প্রশ্ন তুলছেন, দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পরও কেন অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি?
ঘোষিত ২৪ দফা ইশতেহারের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৪ দফায় দৃশ্যমান কাজের অগ্রগতি দেখা গেছে, যা মোট প্রতিশ্রুতির প্রায় ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অর্থাৎ এখনো প্রায় ৮৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ ইশতেহার বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও অধিকার, সংস্কৃতিচর্চার বৈচিত্র্য এবং ক্রীড়া উন্নয়নসংক্রান্ত কিছু উদ্যোগ ছাড়া বাকি অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি এখনো কাগজেই সীমাবদ্ধ।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ছিল- আবাসন সংকট, হলের খাবারের মান, নিরাপদ পরিবহণ ও প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনে দ্রুত দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে। কিন্তু ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও সেই পরিবর্তন না আসায় হতাশা বাড়ছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মোসাব্বিরুল আজিজ আসিফ সারাবাংলাকে বলেন, “রাকসু নির্বাচনে শিক্ষার্থীরা যে প্রত্যাশা নিয়ে শিবির সমর্থিত প্যানেল ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’কে নির্বাচিত করেছিল, তা পূরণে তারা উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে। জুলাই জাদুঘর স্থাপন, অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের অধিকার সংরক্ষণ, প্রশাসনিক কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন, চিকিৎসাকেন্দ্রের আধুনিকীকরণ, নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিতকরণ, পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসি বাস্তবায়ন এবং তথ্যসেবা নিশ্চিতকরণসহ ১২ মাসে ২৪টি সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, গত ৬ মাসে সেসব বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায়নি।”
তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচিত হওয়ার পর আবাসিক হলের খাবারের মানোন্নয়নে কিছু খণ্ডকালীন উদ্যোগ দেখা গেলেও বর্তমানে তা আর অব্যাহত নেই। তবে সম্প্রতি লাইব্রেরি সংস্কারের বিষয়ে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের কথা শোনা গেছে, যা ইতিবাচক দিক। কিন্তু সার্বিকভাবে প্রতিশ্রুতির সিংহভাগই অধরা।’
শিক্ষার্থীদের হতাশা ও ইশতেহারের সিংহভাগই বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে রাকসু’র ভিপি ও শিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘নানান প্রতিকূলতার মধ্যেও শিবির-সমর্থিত প্যানেল শিক্ষার্থীবান্ধব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। হল দখল ও গণরুম সংস্কৃতি বন্ধ, পাশাপাশি ম্যাগাজিন, সাহিত্য আড্ডা ও বিভিন্ন দিবস উদযাপনের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আবাসন সংকট নিরসন, অনাবাসিক ভাতা, ডাইনিংয়ের মানোন্নয়ন ও মেডিকেল সেবা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে প্যানেলের কাজ ও অগ্রগতি অনেকটাই শিক্ষার্থীদের দৃষ্টির আড়ালে রয়েছে।’
রাকসু ভিপি জানান, রাকসু শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতাগুলো তৈরি হচ্ছে, সেগুলো নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রশাসনিক জটিলতা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে এবং প্রয়োজন হলে অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতায় তাদের ন্যায্য দাবিগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
রাকসুতে শিবির প্যানেলের বাইরে থেকে গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে নির্বাচিত হন জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সালাহউদ্দিন আম্মার। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘ছাত্রপ্রতিনিধিদের ইশতেহার ও অঙ্গীকার নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা থাকাটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। আমি বলব, আমি আমার দিক থেকে সফল। আবার যদি শিক্ষার্থীদের দিক থেকে চিন্তা করি, তাহলে আমি শতভাগ হতাশ হতাম।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের ইশতেহারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল শিক্ষার্থীদের শতভাগ আবাসন, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে এসি, প্রাথমিক চিকিৎসা ও খাবারের পেছনে ভর্তুকি। এগুলো নিয়ে আমরা একটা অধিবেশন করি। তারপর ভিসি স্যার তা নোটডাউন করে সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠান।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন আগামী ছয় মাসে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে, শিক্ষার্থীদের শতভাগ আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে মন্নুজান হলের শিক্ষার্থীদের নতুন হলে পাঠানো। সেখানেও আমাদের একটি প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তা হলো, ওই হলে সাড়ে নয়শ’ শিক্ষার্থীর বেশি থাকতে পারবেন না।’
ছয় মাসে রাকসু কেন প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি?- এমন প্রশ্নের জবাবে রাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘গত ছয় মাসে রাকসু কেন প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি, কেন তারা নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হয়েছে- সেটা আমার চেয়ে নির্বাচিত ছাত্রপ্রতিনিধিরাই ভালো বলতে পারবেন। এমনকি সামনে তাদের সুস্পষ্ট কোনো গন্তব্য বা কর্মপরিকল্পনা রয়েছে কি না সে বিষয়েও আমার চেয়ে তারা ভালো জানেন।’
তবে প্রতিবেদক আরও কিছু বিষয়ে প্রশ্ন করতে চাইলে সেগুলোর উত্তর জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।
সুত্রঃ সারাবাংলা.নেট









Be First to Comment