Press "Enter" to skip to content

ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর পাশে থাকার ঘোষণা ট্রাম্পের

নেতানিয়াহুকে পূর্ণ সমর্থন দিলেন ট্রাম্প

ওয়াশিংটন, ১৯ অক্টোবর-ইসরায়েলের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি ‘পূর্ণ ও নিঃশর্ত সমর্থন’ জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনকে সামনে রেখে গতকাল রবিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে নেতানিয়াহুর প্রশংসা করেন তিনি।

ট্রাম্প বলেছেন, নেতানিয়াহু ছাড়া অন্য যেকোনো প্রার্থীই হবেন ‘ভুল’ নেতা। তিনি আরও বলেন, নেতানিয়াহু না থাকলে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে একাই লড়তে হবে।

ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলের নির্বাচনে নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীকে প্রকাশ্যে সরাসরি সমর্থন জানালেন।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর ডাকনাম ব্যবহার করে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘বিবি নেতানিয়াহু আপনাদের কখনো নিরাশ করবেন না!’ ইরানে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের মতবিরোধ চলছিল। এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেছিলেন, ইসরায়েলের নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার কথা তিনি ‘চিন্তাই করেননি’। তাঁর ওই মন্তব্যের পরই রবিবার আকস্মিকভাবে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানান তিনি।

নেতানিয়াহু ও তাঁর মিত্ররা ট্রাম্পের এই সমর্থনকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করছেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর বিরোধীরা বলছেন, তাঁরা ট্রাম্পকে সম্মান করেন ঠিকই, তবে ইসরায়েলের জনগণই নিজেদের নেতা নির্বাচন করবে।

মিত্রদেশগুলোর নির্বাচনে হস্তক্ষেপ না করার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের দীর্ঘদিনের যে প্রথা ছিল, খামখেয়ালি স্বভাবের এই মার্কিন নেতা তা অনেক আগেই ভেঙেছেন। এর আগেও তিনি বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে একাধিক প্রার্থীকে সরাসরি সমর্থন জানিয়েছেন।

রবিবার ট্রুথ সোশ্যালে ‘ইসরায়েলের মহান জনগণের’ উদ্দেশে দেওয়া পোস্টে নেতানিয়াহুর প্রতি ‘পূর্ণ ও নিরঙ্কুশ সমর্থন’ জানান ট্রাম্প। ওই পোস্টে তিনি নেতানিয়াহুকে ‘একজন মহান লড়াকু প্রধানমন্ত্রী এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মোকাবিলায় শান্তির এক বড় মাপের অংশীদার’ বলে উল্লেখ করেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। এই যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়তে থাকায় আগামী মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি ব্যাপক জনসমর্থন হারিয়েছে।

নিজের পোস্টে এই যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে ট্রাম্প বলেন, ‘ছোট শয়তান ও বড় শয়তান’—অর্থাৎ যথাক্রমে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ধ্বংস করার যে প্রতিজ্ঞা ইরান করেছিল, তা তারা বাস্তবায়ন করতই। কিন্তু এর বদলে দেশটি নিজেই ‘সামরিক ও অর্থনৈতিক দুই দিক থেকেই পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে; আর তারা যদি দ্রুত নিজেদের পথ পরিবর্তন না করে, তাহলে আমরা শিগগিরই বাকি কাজটুকুও শেষ করব।’

ট্রাম্প বলেন, ‘ইসরায়েলে যদি ভুল কোনো নেতা আসেন—বিবি ছাড়া অন্য যে কেউই তা হবে—তাহলে এই কাজ আমেরিকাকে একাই করতে হবে। আর আমি তা করতে আগ্রহী নই। খোদ ইসরায়েলের ভেতর থেকে আসা প্রচণ্ড বিরোধিতাসহ নানা ধরনের প্রতিকূলতার মুখেও বিবি নেতানিয়াহু সব সময় দৃঢ়তা, সাহস ও মেধার পরিচয় দিয়েছেন।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘আমি সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতে বিবিকে দেখেছি। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ যেকোনো নারী বা পুরুষ চাপের মুখে ভেঙে পড়তেন। কিন্তু বিবি ভেঙে পড়েননি; বরং আরও শক্তিশালী হয়েছেন এবং আজও সেই একই দৃঢ়তা ধরে রেখেছেন। ইসরায়েলের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এত কিছু করেছে; তাই তাদের কাছ থেকে এমন একজন অংশীদারই আমেরিকা প্রত্যাশা করে।’

ট্রাম্পের সমর্থন ঘোষণার সাত মিনিট পরই তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন নেতানিয়াহু। ওই ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি লেখেন, ‘অসাধারণ সমর্থন ও যৌথ কাজের জন্য ধন্যবাদ, প্রেসিডেন্ট।’

হিব্রু ভাষায় দেওয়া আরেকটি ভিডিও বিবৃতিতে নেতানিয়াহু বলেন, ট্রাম্প ‘আগামী দুই বছর বা তারও আগে ইরানের হুমকি নির্মূল করার’ কাজ শেষ করবেন। তবে তিনি সেই কাজ করবেন শুধু নেতানিয়াহুকে সঙ্গে নিয়ে, অন্য কাউকে নিয়ে নয়।

ট্রাম্পের এই সমর্থন এখন নেতানিয়াহুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে তিনি বর্তমানে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছেন। অধিকাংশ জনমত জরিপের ইঙ্গিত অনুযায়ী, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন জিততে ব্যর্থ হতে পারে তাঁর জোট।

চলতি সপ্তাহের শুরু থেকেই নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানানোর পরিকল্পনা করছিলেন ট্রাম্প। রবিবার অ্যাক্সিওসকে ফোনে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি বরাবরই এটা করতে চেয়েছিলাম। শুধু বেশি আগেভাগে করে ফেলতে চাইনি।’

ট্রাম্প বলেন, নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর ‘সুসম্পর্ক’ রয়েছে। নেতানিয়াহু আবার নির্বাচিত হলে তাঁরা একসঙ্গে ‘ভালো কাজ’ চালিয়ে যেতে পারবেন বলেই তিনি এই সমর্থন জানিয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট অ্যাক্সিওসকে আরও বলেন, ‘ইসরায়েলের নেতৃত্বে এমন একজন থাকা জরুরি, যার ওপর সেখানকার মানুষ ভরসা করতে পারবে।’

ইসরায়েলের অন্য কোনো নেতার সঙ্গে তিনি কাজ করতে পারবেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘হয়তো পারব, হয়তো পারব না। কিন্তু সেই ঝুঁকিটাই বা কে নিতে চায়?’

ইরান ও গাজাকে কেন্দ্র করে গত কয়েক মাসে দুই নেতার মধ্যে টানাপোড়েন বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুকে সমর্থন জানানোর বিষয়ে এত দিন বারবার অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিলেন ট্রাম্প।

এর আগে অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বীদের একাংশ ট্রাম্পকে নিরপেক্ষ থাকার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের একাংশেরও মত ছিল, নেতানিয়াহু নির্বাচনে হেরে গেলে এবং ইসরায়েলে নতুন সরকার গঠিত হলে পশ্চিম এশিয়ায় ট্রাম্পের কূটনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা অনেক সহজ হবে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্পও নেতানিয়াহুর ওপর বিরক্ত ছিলেন। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এ বিষয়ে সরাসরি কথা হয়েছে, এমন দুই ব্যক্তির দাবি অনুযায়ী, অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ঠেকাতে ইসরায়েলের ব্যর্থতার জন্য নেতানিয়াহুকেই দায়ী করেছিলেন ট্রাম্প। এমনকি নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছিলেন তিনি।

তবে সব ধরনের টানাপোড়েন সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুর পাশেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ট্রাম্প।

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের আগেই ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানো যায় কি না, তা নিয়ে দুই সপ্তাহ আগে আলোচনা করেছিলেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু।

প্রথমে নেতানিয়াহুর প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে আবার হামলা শুরু করার দিকে ঝুঁকেছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু পরে তিনি দ্বিধায় পড়ে যান। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

তবে রবিবারের সমর্থনবার্তায় ট্রাম্প লিখেছেন, ‘বাকি কাজটুকুও আমরা শিগগিরই সেরে ফেলব।’ ধারণা করা হচ্ছে, এর মাধ্যমে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর নেতানিয়াহুকে ইরানে হামলা চালানোর সবুজ সংকেত দিয়ে রাখলেন তিনি।

এস এম/ ১৯ অক্টোবর ২০২৬

More from আন্তর্জাতিকMore posts in আন্তর্জাতিক »

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Mission News Theme by Compete Themes.